নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার ৩ লাখ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জই ছিল ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। উচ্চমূল্যের এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে বছরের পর বছর ক্যাপাসিটি চার্জের নামে দেড় দশকে বিপুল টাকা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের পকেটে চলে গেছে। এতে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় দিনে দিনে বেড়েছে। আর এই ব্যয়ের দায় চেপেছে জনগণের ওপরে। ফলে দফায় দফায় বেড়েছে বিদ্যুতের দাম।
বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজশাহীতে ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি-২০২৪-এর আলোকে ‘জ্বালানি খাত উন্নয়নে সুবিচার সংকট’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য উঠে আসে। দুপুরের দিকে নগরীর একটি রেস্তোরাঁর সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের নিয়ে এ সভার আয়োজন করে ক্যাবের যুব সংসদ, রাজশাহী।
এতে জানানো হয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা চাহিদার চেয়ে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বেশি রাখাই নিয়ম, যাকে বলা হয় রিজার্ভ মার্জিন। এটি সাধারণত অব্যবহৃতই থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের রিজার্ভ মার্জিন ৩৫ শতাংশের বেশি। অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে সরকারকে অনেকগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। আর সরকারি কোষাগার থেকে তাদের জন্য গুনতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ।
ক্যাপাসিটি চার্জ হচ্ছে এমন চার্জ, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও উৎপাদনক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রগুলোকে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ খাতের জন্য দেওয়া ভর্তুকির ৮১ শতাংশই ব্যয় হয় এই ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে।
সভায় বলা হয়, ২০১০ সালে রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট নাম দিয়ে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সূচনা হয়। বেসরকারি খাতে সুযোগ মানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেটি না করে সরকার গোষ্ঠীবিশেষকে প্রতিযোগিতাহীন বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে। এতে জ্বালানি খাতে ভয়াবহ লুণ্ঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কমিশন বাণিজ্যের জন্য রাজনীতিবিদ ও আমলারা এসব অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনুমোদন দিয়েছেন। জনতুষ্টির জন্য নেওয়া এসব উদ্যোগ আস্থাভাজন উদ্যোক্তা গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দিতে করা হয়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরের বেশির ভাগ সময় অলস পড়ে আছে। কিন্তু দিতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ।
সভায় জানানো হয়, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৬ হাজার ৫৭৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। আর তাপমাত্রা বাড়লে তা দাঁড়ায় সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ সক্ষমতার বিদ্যুৎ ব্যবহার ধরলেও প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকে। অনিশ্চিত উৎসের ওপর ভর করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সরকারের দেনা বাড়িয়েছে। তরল জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদনের বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপরে পড়েছে।
বক্তারা বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা টেকসই রাখতে এখনই প্রয়োজন স্বচ্ছ মূল্যহার, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কাঠামো এবং দক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন। অন্যথায় আমদানি নির্ভরতা, জ্বালানি ঘাটতি ও মূল্য অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তারা বলেন, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৭) অর্জনের জন্য সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমানে দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ, সঠিক মূল্যনীতি প্রণয়ন এবং দুর্নীতি দমন ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা টেকসই করা সম্ভব নয়।
তারা আরো বলেন, একজন মানুষ বছরে রান্নার জন্য অন্তত ৩৫ কেজি এলপিজি এবং ১২০ ইউনিট বিদ্যুতের সুবিধা না পেলে তাকে জ্বালানি দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। জ্বালানি দারিদ্র্য দূর না হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমানের অগ্রগতি সম্ভব নয়।
ক্যাবের রাজশাহী যুব সংসদের সভাপতি জুলফিকার আলী হায়দারের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম।প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাজিফা তাজনুর ও অরিত্র রোদ্দুর ধর। বক্তব্য রাখেন লেখক ও গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, আহমেদ শফি উদ্দিন প্রমুখ।


















