নিজস্ব প্রতিবেদক : ভারতকে খুনি আখ্যায়িত করে মৎস ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্ঠা ফরিদা আখতার বলেছেন, ৪৯ বছর ধরে ভারত ফারাক্কা বাঁধ নামক মরণ ফাঁদ পেতে বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা করছে। তারা বাংলার মানুষকে পানির ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। ভারতের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও জনমত তৈরি করে আমাদের অধিকার আদায় করতে হবে।
শুক্রবার বিকেলে রাজশাহী কলেজ মিলানায়তনে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৪৯ বর্ষপূর্তি উপরক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। মৎস ও প্রাণি সম্পাদ মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্ঠা বলেন, আমরা গত ১৬ বছর ফারাক্কা দিবস পালন করতে পারিনি। বিগত দিনে যারা এই দিবসটি পালন করেছেন তারা জানেন ফারাক্কা দিবস পালন করতে গিয়ে কতটা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।
কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর এই প্রথম আমরা স্বাধীনভাবে ফারাক্কা দিবস পালন করতে পারছি। ১৯৭৬ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি লং মার্চ করেছিলেন। ওই একই সময় ফারাক্কার বিষয় জাতিসংঘের কাছে তুলে ধরেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। মাওলানা ভাসানি কখনো ফারাক্কা বাঁধ বলেন নি। তিনি বলতেন এটা মরণ ফাঁদ। তিনি বলেন, এই ফারাক্কার বাঁধের কারণে কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়েছে। অনেকেই আদি পেশা ছেড়ে অন্য পেশা ধরেছেন।
এমন কি অনেকেই নদী এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কারণ এক সময় পদ্মার ইলিশের কদর ছিল। বিভিন্ন নদী থেকে পদ্মায় ইলিশ আসতো। পদ্মার ইলিশের স্বাদও ছিল ভাল। পদ্মার ইলিশ এক বাড়িতে রান্না করলে কয়েক বাড়িতে এর গন্ধ চলে যেতো। কিন্তু ফারাক্কার কারণে এখন আর সেই পদ্মায় ইলিশ পাওয়া যায় না। এমন কি পদ্মায় যারা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারাও আর নেই। উপদেষ্ঠা বলেন, আমি মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর বলেছিলাম আগে বাংলার মানুষ ইলিশ খাবে, তারপর রপ্তানি।
সেই সময় ভারতের এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে, তাহলে কি আমাদের আর ইলিশ খেতে দিবেন না। আমি বলেছিলাম আপনাদের গঙ্গায় ইলিশ আছে সেগুলো আপনারা খাবেন। কিন্তু তিনি উত্তরে বললেন, গঙ্গার ইলিশ আর পদ্মার ইলিশের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। পদ্মার ইলিশ আমাদের কত বড় সম্পদ ছিল তা এখন বুঝতে পারি। শুধু ইলিশ নয়, ফারাক্কার প্রভাব পড়েছে গবাদি পশুর উপরও।
গবাদি পশু ও মৎস বিভাগে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা যে কত তা আমরা জানি। তিনি বলেন, মাওলানা ভাসানি শুধু একটা লং মার্চ করেই এটা শেষ করেনি। এটা একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি এগিয়ে গেছেন। তিনি ফারাক্কার বিষয় নিয়ে ইন্দ্রিরাগান্ধিকে চিঠি লিখেছিলেন। ইন্দ্রিরাগান্ধি ওই চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন। পরে তিনি ইন্দ্রিরাগান্ধির চিঠির সূত্র ধরে নানান ধরনের তর্ক করেছিলেন। মাওলানা ভাসানি তার চিঠির মধ্যে ফারাক্কার ব্যাপক ভিত্তিক স্থায়ী সমাধান চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন এটা এক বা দুমাস স্থায়ী না করে বছর ভিত্তিক স্থায়ী করতে হবে। এতে ইন্দ্রিরাগান্ধি মেনে না নেয়ার মাওলানা ভাসানি লংমার্চ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
উপদেষ্ঠা বলেন, লং মার্চের সময় মাওলানা ভাসানি অসুস্থ্য ছিলেন। তারপরও তিনি কয়েকজন মানুষের কাঁধে ভর করে বর্জকণ্ঠে বক্তব্য দিয়েছিলেন। যে বক্তব্য ঐতিহাসিক বক্তব্য হিসাবে পরিচিত। ভাসানির সেই ভাষনের সূত্র ধরেই নতুন প্রজন্ম উজ্জিবিত হয়ে ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান ঘাটিয়েছে। তিনি বলেছিলেন গঙ্গার পানি আমাদের ন্যায্য অধিকার, এটা প্রাকৃতিক অধিকার, এই অধিকার পশুপাখি, কীটপতঙ্গসহ সবার। এই অধিকার হরণ করার ক্ষমতা কারো নেই। যে হরণ করেছে সে প্রাণের বিরুদ্ধে জুলুম করেছে। বাংলাদেশের মানুষ তা কোনো দিন মেনে নিবে না। ভাসানি আকাসের দিকে হাত তুলে বলেছিলেন, আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের বাঁচার পথ দেখোবেন।
মৎস ও প্রাণি সম্পাদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্ঠা বলেন, চুক্তি শেষ হলে আমরা পানির হিস্যা চাইবো। আমরা কারো দয়ায় চাচ্ছি না, আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাচ্ছি। আমাদের সেই ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের চার কোটি মানুষ ফারাক্কার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত। এক্ষেত্রে ভারত তো অপরাধি। তাদের বিচার হওয়া দরকার। ভারতকে আমরা অপরাধি হিসাবে চিহ্নিত করে বিচার চাইবো। কারণ এতো বছর ধরে ভারত আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছেন। মানুষকে তীলে তীলে হত্যা করছে। এই হত্যার দায়ে ভারতের বিচার করা দরকার।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রেস ইন্সিটিউটের মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন ফাক্কার বাঁধ দিয়ে মরণ কামড় দিয়েছে ভারত। আমাদের এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমাদের নায্যা অধিকার আমাদের আদায় করে নিতে হবে। আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা ভারতের কাছ থেকে আমাদের অধিকার আদায় করে নিবো। তিনি বলেন, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি ৪৯ বছর আগেই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমাদেরও দাঁড়াতে হবে। বাঁধটাই ধ্বংস করতে হবে।
ভারতেও এ নিয়ে আন্দোলন রয়েছে। আমাদের সামনে এটাই শেষ সুযোগ চরম আন্দোলনের মাধ্যমে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণ করার।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব। তিনি বলেন, ‘ফারাক্কা আমাদের অভিশাপ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ১৮ কোটি মানুষের দেশে নদী বিশেষজ্ঞ পাঁচজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভারতের কাছ থেকে পানি আদায় করতে হলে আমাদের নিজস্ব নদী বিশেষজ্ঞ দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে নদী আইন বিষয়ক একটি বিভাগ খোলা উচিত। ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার পর বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ করাও জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিগত ১৬ বছরে ভারতের তাঁবেদারি করেও ন্যায্য হিস্যা আদায় করা যায়নি। এখন অন্যান্য দলও ভারতকে তুষ্ট করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।
এই স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে হবে। এ জন্য আমাদের ছাত্র-জনতাকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও নদী গবেষক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘ভারত সব সময় গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রকে একই অববাহিকা ধরে সমস্যা সমাধানের কথা বলে। কিন্তু এভাবে সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণ করতে হবে। শুধু গঙ্গার পানি চেয়ে কাজ হবে না, প্রধান দাবি হতে হবে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণ।’
লেখক ও গবেষক বেনজিন খান বলেন, ‘ভারত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভাগিরথী নদী থেকে পলিমুক্ত পানি সরিয়ে নিচ্ছে, আর বর্ষা মৌসুমে আমাদের পলিযুক্ত পানি দিচ্ছে। এতে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে, বন্যায় দেশ ডুবে যাচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি গণহত্যার সামিল। এই অবস্থা চলতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘উজানের দেশ ভাটির দেশের অসম্মতিতে নদীতে কোনো কাজ করতে পারে না। অতিরিক্ত পানি তুলতেও পারে না—আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী। তাই এই বাঁধ অবৈধ। এখন পানির হিস্যা নয়, আমাদের দাবি হতে হবে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণ।
এজন্য ভারতের প্রতিবেশী শত্রু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। কারণ শত্রুর শত্রুই বন্ধু।’ অন্যান্য বক্তারা বলেন, আওয়ামীগ ভারতকে প্রভু মেনে নিয়েছিল। তারা ক্ষমতায় থাকার সময় ভারতের সার্বিক সহযোগিতা নিয়েছে। যার কারণে বাংলার মানুষ নিশ্বেস হতে চললেও কোনো কথা বলেনি। ভারত আমাদের প্রতিবেশি, তারা যে প্রতিবেশি প্রতিবেশের মত আচরণ করুক এই আমরা চাই। আমরা তাদের সাথে দ্বন্দ্ব চাই না, চাই প্রতিবেশি সুলভ আচরণ। নয় তো ফারাক্কার হিস্যা বুঝে নিতে আমরা আন্দোলন করতে বাধ্য হবো।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে ফারাক্কা লংমার্চের ৪৯ বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক, নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘আগের সরকারের নানামুখী বাধা উপেক্ষা করে ২০১৪ সাল থেকে আমরা এই দিবসটি উদযাপন করে আসছি। এখন এই আন্দোলনে যুবসমাজ যুক্ত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিগত সরকার সামনে একজনকে দাঁড় করিয়ে বাকি সবাইকে অগোচরে রেখেছে। আমি দাবি করব, পাঠ্যপুস্তকে যেন মওলানা ভাসানীকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’
এসময় উপস্থিত ছিলেন, রাজশাহী বারের সভাপতি এড. আবুল কাসেম, রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ মু. যহুর আলী। সভায় মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাবির রেজিষ্ট্রার প্রফেসর ড. ইফতেখারুল আলম মাসউদ। এরআগে মাহবুব সিদ্দিকীর নদী বিষয়ক একটি বইয়ের মোড়ক উম্মোচন করেন অতিথিবৃন্দ। সভা সঞ্চালনায় ছিলেন লেখক ফজলুল হক তুহিন ও সাংবাদিক সাদিকুল ইসলাম স্বপন।
এরআগে আগে রাজশাহী কলেজের সামনে থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে গিয়ে শেষ হয়। পরে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এলে রাজশাহী কলেজ বিএনসিসির পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।


















