শুক্রবার , ২ আগস্ট ২০২৪ | ২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. অর্থনীতি
  2. আইন ও আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কলাম/মতামত
  6. কৃষি
  7. খেলা
  8. জাতীয়
  9. ধর্ম
  10. নামাজের সময়সূচি
  11. নারী ও শিশু
  12. প্রচ্ছদ
  13. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ সংবাদ

পুলিশের ‘ব্লক রেইডে’ গণ-গ্রেফতার, নিখোঁজ, রিমান্ডে নির্যাতনসহ যত অভিযোগ

প্রতিবেদক
editor
আগস্ট ২, ২০২৪ ৮:৫৫ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক : রাজধানীর মিরপুরে একটি রেস্টুরেন্টের শ্রমিক শাওন হাওলাদার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান অভিযানে তিনি আটক হন নিজ বাসার সামনে থেকে। আটকের পর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয় তাকে।
পুলিশ সদস্যরা যখন হাতকড়া পরানো অবস্থায় শাওন হাওলাদারকে আদালত ভবনে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিন বছরের শিশু কন্যাকে নিয়ে পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছিলেন তার স্ত্রী সুমাইয়া খাতুন। স্বামী, স্ত্রী এবং সন্তান-তিনজনই কাঁদছিলেন উচ্চস্বরে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিবিসিকে বলছিলেন সুমাইয়া খাতুন, ‘মিরপুরে যখন মারামারি হইছিল, আমার স্বামী মোবাইলে ভিডিও করছে। এর দু’দিন পর বাড়ির সামনে ওরে দেইখ্যা পুলিশ ডাক দিছে। মোবাইল সার্চ কইরা যখন ভিডিওগুলো দেখছে, ওরে ধইরা নিছে।’
তার দাবি, তার স্বামী কোনো ‘গণ্ডগোলে’ ছিলেন না।
তিনি বলেন, ‘তার একটা পা ভাঙা। ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। সে ক্যামনে মারামারি করবে? তারে ক্যান পুলিশ আটকাইলো?’
বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে ধরপাকড় শুরু করেছে, সেখানে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ আটক হয়েছেন বলে খবর দিচ্ছে গণমাধ্যমগুলো।
অভিযোগ উঠছে, মধ্যরাতের এসব ব্লক রেইডে ‘নির্বিচারে’ আটকের শিকার হচ্ছেন অনেকে। এছাড়া আটকের পর নিখোঁজ থাকা, এমনকি রিমান্ডে নির্যাতনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
‘গুলি, লুটপাট, ভাঙচুরের’ অভিযোগ
সাভারে স্থানীয় বিএনপির সাবেক এক নেতা খোরশেদ আলম। গত ২০ জুলাই বিকেলে খোরশেদ আলমের খোঁজে তার শ্বশুরের বাসায় অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সেদিন বাসায় খোরশেদে ছিলেন না। তার পরিবার জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাসায় ঢুকেই কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এরপর ভাঙচুর করতে থাকে গ্যারেজে রাখা গাড়ি। বাদ যায়নি ঘরের আসবাবপত্র, টিভি, ফ্রিজ, এসি কোনোকিছুই।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির একপাশে স্তূপ করে রাখা আছে ভাঙচুর হয়ে যাওয়া সকল জিনিসপত্র। দেয়ালে গুলির চিহ্ন।
খোরশেদ আলমের স্ত্রী কাওসার হাবিবা, ‘প্রায় ২৬ গাড়ি পুলিশ আসে বাড়ির সামনে। কেউ ছিল পোশাকে, কেউ ছিল টি-শার্ট পরা এবং হাতে লাঠি নিয়ে। এছাড়া বহিরাগতও ছিল। আমার ড্রয়িং রুম ছিল লোকে ভরা।’
তিনি জানান, সেদিন বাসায় কোনো পুরুষ মানুষ ছিলেন না। একপর্যায়ে অভিযানে আসা পুলিশ সদস্যরা তাকে এবং তার মাকে ঘুরে ঢুকতে বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা দু’জন ঘরে ঢুকতেছি, এমন সময় পেছন থেকে কে যেন টান দিয়ে আমার গলা থেকে স্বর্ণের চেইনটা ছিঁড়ে নিলো। আমি ভয়ে কিছু না বলেই ঘরে ঢুকে পড়ছি। ওদের ভাঙচুর শেষে চলে যাওয়ার পর পাশের ঘরে দেখি ড্রয়ারে রাখা সাড়ে তিন লাখ টাকা নেই। সেদিনই আমি একটা পুরনো গাড়ি বিক্রি করে টাকাটা রাখছিলাম।’
কাওসার হাবিবা জানান, সেদিনের অভিযানের পর থেকেই তার ভাইয়ের সাত বছর বয়সী ছেলে অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
তিনি বলেন, ‘বাচ্চাটা দেয়ালে একটা বলের শব্দ হলেও ভয় পায়। হেলিকপ্টারের শব্দ শুনলে পর্দার আড়ালে লুকায়। সেদিন পুলিশ যখন ঢুকছিল, তখন সে আমাকে বলছিল যে, আমাদেরকে কি এখন গুলি করবে? আমরা কি মারা যাব?’
কাওসার হাবিবা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান করবে। কিন্তু ভাঙচুর, গুলি, লুটপাট কেন করছে সেটা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাদের সাথে ‘হিংস্র আচরণ’ কেন করা হলো তারও কোনো জবাব নেই তার কাছে।
‘ঘুম ভেঙেই দেখি ওরা আমার বেডরুমে’
সাভারে কাওসার হাবিবার বাসায় অভিযান হয়েছে দিনের বেলা। কিন্তু সম্প্রতি গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতা নুরুল হক নূরের বাড়িতে অভিযান হয়েছে মধ্যরাতে।
তার স্ত্রী মারিয়া আক্তার জানান, ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙার বিকট শব্দে ঘুম ভাঙার পর তিনি দেখতে পান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন তার বেডরুমের ভেতরে।
তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমি বিকট শব্দে ঘুম ভেঙৈ বিছানা থেকে শুধু উঠে দাঁড়িয়েছি। এরমধ্যেই দেখি আমার রুমের ভেতরে ওরা। তাদেরই কেউ লাইট জ্বালানোর পর দেখি অস্ত্র হাতে ঘরভর্তি মানুষ। আমাদের তো একটা প্রাইভেসি আছে। আমরা সন্তানসহ স্বামী-স্ত্রী ঘুমিয়ে আছি। সেখানে তারা এভাবে কেন ঢুকে পড়বে?’
তিনি আরো বলেন, ‘আর তারা লাইট জ্বালানোর পর নুরকে দেখেই অকথ্য ভাষায় গালি দিতে শুরু করে। তারপর প্রায় থাবা দিয়ে মিনিটের মধ্যেই টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে নিয়ে যায়। কেন নিচ্ছে, তারা কারা কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিলো না।’
মারিয়া আক্তার জানান, তার ভাষায় কোনো পরোয়ানা ছাড়াই আটকের পর চল্লিশ ঘণ্টা নুরুল হকের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এরপর যখন গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়, সেখানেও করা হয়েছে নির্যাতন।
তিনি বলেন, ‘রিমান্ড শেষে যেদিন আদালতে হাজির করা হয়, সে হাঁটতে পারছিল না। নুর আমাকে নিজেই বলেছে, রিমান্ডে ওকে ছাদের সাথে উল্টা করে পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। ওকে লাথি মেরেছে ফুটবলের মতো, পিটিয়েছে ইচ্ছেমতো। ওকে এমনভাবে নির্যাতন করা হয়েছে যে আমি একজন নারী হিসেবে আপনার সামনে সেটা উচ্চারণ করতে পারছি না। ওকে ইলেক্ট্রিক শক দেয়া হয়েছে। ওকে এমন এমন জায়গায় আঘাত করা হয়েছে, যেটা আমি এখন ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। এই নির্যাতনের কারণে ও হাঁটতে পারছে না।’
পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের?
বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয় মূলত ১৯ জুলাই থেকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষত ঢাকার নির্দিষ্ট এলাকা ঘিরে মধ্যরাতে ‘ব্লক রেইড’ দিয়ে চলে গ্রেফতার অভিযান। এসব অভিযানে রাজনৈতিক নেতাকর্মী তো বটেই, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, দিনমজুরসহ আটক হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।
গত দু’সপ্তাহের অভিযানে দেশের গণমাধ্যমগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ১০ হাজারেরও বেশি আটকের তথ্য দিচ্ছে। এসব অভিযানে শুধু সাধারণ মানুষের হয়রানি নয়, বরং একইসাথে মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও অভিযোগ উঠছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে, বিনা-পরোয়ানায় গ্রেফতার, আটকের পর স্বীকার না করা, আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির না করা, গ্রেফতার অভিযানের সময় ভয়-ভীতি দেখানো, মারধর এমনকি গুলি করা এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন যার মধ্যে অন্যতম।
সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চরমভাবে আইনের অবমাননা করছে।’
তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ আমলেও পুলিশ কারো বাড়িতে মধ্যরাতে অভিযান করতো না। বাড়ি ঘেরাও দিয়ে রেখে সকালে ঢুকতো। কিন্তু এখন মধ্যরাতে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তারা গেটে ঠক ঠক করছে। এটা কি ৭১ সাল? ৭১ পাকিস্তান বাহিনী ঘরে ঘরে গিয়ে বলতো মুক্তি আছে? এখন এরা জিজ্ঞাসাবাদ করছে, ছাত্র আছে?’
জেড আই খান পান্না বলেন, তার ভাষায় পুলিশ গ্রেফতারের সময় আইন মানছে না।
তিনি বলেন, ‘আইনে কোথাও নেই যে কাউকে বিনা-পরোয়ানায় গ্রেফতার করা যাবে। এমনকি ৫৪ ধারায় কাউকে অ্যারেস্ট করলেও এ বিষয়ে আপিল বিভাগের নির্দেশনা আছে। তিন ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হবে কী মামলায় এবং কেন তাকে গ্রেফতার করা হলো। এছাড়া তার নিকটআত্মীয় স্বজন, আইনজীবীর সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা তারা মানতে বাধ্য। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করছে। এছাড়া কোর্টে যাদের পাঠাচ্ছে, সেখানেও নাবালক দেখা যাচ্ছে। নাবালককে তো কোনো অবস্থাতেই জেলখানায় পাঠাতে পারে না।’
তবে শুধু আটকের সময় আইনের লঙ্ঘন নয়, আটকের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগও এখন জোরালো।
যদিও হেফাজতে থাকাকালীন আটক ব্যক্তির সাথে আচরণ কী হবে সেটার বিস্তারিত বলা আছে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে। যেখানে সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শাস্তি দেয়া এমনকি ভয়-ভীতি দেখানোও অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেড আই খান পান্না প্রশ্ন রাখেন, ‘সংবিধানেইতো আছে কোনো অবস্থাতেই গায়ে হাত দিতে পারবে না, জোর-জবরদস্তি করতে পারবে না। এছাড়া ডিবি অফিসে যে নিয়ে রাখা হচ্ছে, সেটারই বা আইন কোথায়? সেখানে কি থানা আছে, হাজতখানা আছে? আর সাদা পোশাকে যদি তুলে নেয়, তাহলে অবশ্যই সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়। ধরলাম, এটা যদি ডাকাতও তুলে নেয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেটা ধরবে না?’
কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কেন উঠছে? জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের থেকে অবশ্য পাল্টা দাবি করা হয়, অভিযানে আইনের কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বিবিসি বাংলাকে বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘অ্যারেস্ট বা মামলা যেগুলো হচ্ছে, সেগুলো কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই হচ্ছে। এছাড়া আমরা যখন অভিযান করি তখন আমাদেরকে একটা প্রসিডিউর মেনেই করতে হয়, আইনের নিরিখেই করতে হয়। আপনি যেসব অভিযোগ করছেন, সেরকম কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। আইনি প্রক্রিয়া মেইনটেইন করেই আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’
সূত্র : বিবিসি

সর্বশেষ - অন্যান্য