নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় স্থানীয় আ’লীগের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুলের (৫০) নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) বেলা ১১টায় বাঘা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উপজেলার নিজ গ্রাম গাওপাড়া গ্রামের পারিবারিক গোরস্থানে বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
এদিকে আ’লীগ নেতা বাবুলের লাশ সামনে রেখে জানাজা নামাজের আগে স্থানীয় এমপি শাহরিয়ার আলমের বক্তব্যে ক্ষমতাসীন দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বাবুলের জানাজা থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল কুমার সরকারকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। অনিল কুমার সরকারের সঙ্গে যখন এ ঘটনা ঘটে, তখন পাশেই বাবুলের লাশ সামনে নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের এমপি ও বাঘা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহরিয়ার আলম।
বাবুলের মৃত্যুর জন্য তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ এবং বাঘা উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লায়েব উদ্দিন লাভলুকে অভিযুক্ত করেন।
এসময় শাহরিয়ার আলম আরো বলেন, খুনি আক্কাছ (বাঘা পৌরসভা মেয়র), খুনি মেরাজ (ইউপি চেয়ারম্যান)। তাদের পেছনে মদদদাতা আছে। দুই বছর আগে আক্কাছ বহিষ্কৃত হয়েছিল আওয়ামী লীগ থেকে। খায়রুজ্জামান লিটন নিজের মুখে সেই কথা এখানে বলেছিলেন। এসএম কামাল বলেছিলেন, সে বহিষ্কৃত। এই ঘোষণার সাত দিনের মাথায় খায়রুজ্জামান লিটনের গাড়িতে আক্কাছ ও মেরাজকে ঘুরতে দেখা গেছে।
শাহরিয়ার আলম বলেন, আমরা জবাব চাই, আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলির সদস্য খায়রুজ্জামান লিটনের কাছে। লায়েব উদ্দিন লাভলুর কাছে জবাব চাই, সে কেন আজ পলাতক? খুনের মামলায় দুজন সশরীরে উপস্থিত ছিল। পেছন থেকে মদদদাতা হিসেবে আসাদুজ্জামান আসাদ, এএইচএম খায়রুজ্জামান এবং লায়েব উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা হবে। তাদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকব। আমাদেরও দায়িত্ব আছে।
জেলা আ’লীগের সভাপতি অনিল কুমার সরকার গণমাধ্যমকে জানান, তাকে জানাজার স্থান থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নিহত বাবুলকে শ্রদ্ধা জানাতে একটি ফুলের ডালাও নিয়ে গিয়েছিলেন। সেটিও মরদেহে দিতে দেওয়া হয়নি। অনিল কুমার সরকার বলেন, আমাকে দেখে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পুঠিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ মোল্লা অপমানজনক কথা বলেন। আমাকে বলা হয়, আপনি এখানে কেন? আপনি বেরিয়ে যান।
জানাজায় শাহরিয়ার আলমের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে জানতে চাইলে এমপি আসাদুজ্জামান আসাদ গণমাধ্যমকে বলেন, বাবুল ত্যাগী নেতা। আমার হাতেই তৈরি। আহত হওয়ার পর থেকেই সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছি। হাসপাতালে গিয়েছি। তার মৃত্যু আমাদের কাছে দুঃখজনক। তার খুনের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, সবার বিচার হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এমপি শাহরিয়ার আলম আমাদের মদদাতা হিসেবে উল্লেখ করে সাতদিনের কলরেকর্ড তুলতে বলেছেন। আমি ডিআইজি-এসপিকে ফোন করে বলেছি, সাতদিন না, সাত মাসের কল রেকর্ড তুলে দেখেন।
আসাদ বলেন, এ মামলার যারা আসামি তারাও দলের জন্য ত্যাগী। কিন্তু বাবুল হত্যার বাদী হলো হাইব্রীড আওয়ামী লীগ। সব বাদ দিয়ে হাইব্রীড কেন বাদী? শাহরিয়ার সাহেব যা বলেছেন, তা তাকে প্রমাণ করতে হবে, তা না হলে তাকেও মামলার মুখোমুখি হতে হবে।
শাহরিয়ারের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বাবুল যখন ছাত্রনেতা, তখন থেকেই তাকে আমি পাশে পেয়েছি। বাবুল সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা ছিলেন, আমার অনেক স্নেহভাজন ছিলেন। আমি আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তাকে পাশে পেয়েছি। তিনি নিবেদিত প্রাণ আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করার মতো নিন্দনীয়-নৃশংস ঘটনার সঙ্গে আমার কোনভাবে জড়িত থাকার কোন কারণ নেই, কোন সুযোগ নেই, যুক্তিও নেই। মরহুমের জানাজায় আমাকে দায়ী করে, সরাসরি আমার নাম ধরে, আমার দলীয় পদ উল্লেখ করে, আমার পাশাপাশি আমাদের আরেকজন এমপি আসাদুজ্জামান আসাদ সহ আরো কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বাঘা-চারঘাটের বর্তমান এমপি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ঈর্ষাপরায়ণভাবে এ রকম উক্তি করতে পারেন, সেটা আমার বোধগম্য নয়। জানাজা নামাজের মতো একটি পবিত্র কাজ, যেখানে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা হয়, সেখানে এভাবে মামলা করা হবে, মোবাইল কললিস্ট চেক করা হোক, মামলার আসামি করা হবে-এই সমস্ত কথা তার কাছ থেকে আমি আশাই করিনি। তিনি কী উদ্দেশ্যে বলেছেন, কেন বলেছেন তা তিনিই বলতে পারবেন। যারা রাজনীতি সচেতন ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ তারা নিশ্চিয় এ রকম কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করবেন না। করার কোন কারণ নেই।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার (২৬ জুন) বিকেল সাড়ে ৪টায় মৃত্যুবরণ করেন বাঘা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুল।
রামেক হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মাথায় গুরুতর জখম হয়েছিল বাবুলের। এজন্য প্রচুর রক্তক্ষরণও হয়েছিল তার। ঘটনার পর রামেক হাসপাতালে নেওয়া হলে তার জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপরই তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে মাথার যেখানে জখম ছিল সেখানে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছিল। তাই শেষ পর্যন্ত তাকে আর সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি। বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এর আগে গত ২২ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাঘা উপজেলা সদরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টার ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মী ও পথচারী আহত হন। তাদের মধ্যে বাবুলের অবস্থা ছিল আশংকাজনক। পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ ও পরে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
উপজেলা আ’লীগের বর্তমান কমিটির নেতৃত্বে যারা রয়েছেন তাদের বেশির ভাগই স্থানীয় এমপি শাহরিয়ার আলমের অনুসারী। তাদের নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় আ’লীগের একটি অংশ। আর আ’লীগের আরেকটি অংশের নেতাকর্মীরা রয়েছেন বাঘা পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আক্কাছ আলী এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লায়েব উদ্দিন লাভলুর নেতৃত্বে। আ’লীগ নেতা বাবুল ছিলেন স্থানীয় এমপি শাহরিয়ার আলমের অনুসারী।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে উভয় গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসলেও সর্বশেষ ঘটনার সূত্রপাত হলো- বাঘা উপজেলা দলিল লেখক সমিতির নামে কিছু লোক জমির দলিল রেজিস্ট্রির সময় দিনের পর দিন বাড়তি টাকা আদায় করে আসছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ এই সমিতিকে সমর্থন দিয়ে থাকে। আর অপর একটি অংশ দলিল লেখক সমিতির এই দৌরাত্বের বিপক্ষে। দলিল লেখক সমিতিকে সমর্থন দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্বে ২২ জুন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা।
সূত্র বলছে, ১৯ জুন দলিল লেখক সমিতির নতুন কমিটির সভাপতি হিসেবে উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি শাহিনুর রহমান পিন্টু ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পাকুড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শামিউল আলম নয়ন দায়িত্ব নিতে যান। সেদিন সাধারণ দলিল লেখকেরা অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রতিবাদ করেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
এরই প্রতিবাদে পরদিন ২০ জুন দলিল লেখকদের একাংশ মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে। এই মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লায়েব উদ্দিন লাভলু, বাঘা পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আক্কাছ আলী এবং পাকুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেরাজুল ইসলাম। কর্মসূচিতে তারা দলিল লেখক সমিতির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধ করার দাবি জানান।
পরে ২২ জুন দলিল লেখক সমিতির দৌরাত্ন বন্ধের দাবিতে বাঘা উপজেলার সচেতন নাগরিকের ব্যানারে উপজেলা চেয়ারম্যান লায়েব উদ্দিন লাভলু, পৌরসভার মেয়র আক্কাছ আলী ও ইউপি চেয়ারম্যান মেরাজুলের সমর্থকেরা বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন। আর একই দিন একই সময়ে বাঘা পৌরসভার মেয়র আক্কাছ আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে মানববন্ধন কর্মসূচি আহবান করে বাঘা উপজেলা আওয়ামী লীগ। পাল্টাপাল্টি এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে আগের দিনই উত্তেজনা দেখা দেয়। ২২ জুন কর্মসূচির জন্য দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকেরা উপজেলা চত্বরে জড়ো হলে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে দুই পক্ষের ৫০ জন নেতা-কর্মী ও পথচারী আহত হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুল। রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় বুধবার বাবুল মারা গেলেন।
এদিকে ২২ জুনের সংঘর্ষের ঘটনায় সেদিন দিবাগত রাতেই থানায় মামলা করেন উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি পিন্টু। এ মামলায় বাঘা পৌরসভার মেয়র আক্কাছ আলীসহ ৪৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ২০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় আসামিদের মধ্যে ইউপি চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতা মেরাজুল ইসলামসহ আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আর গ্রেফতার এড়াতে বাঘা পৌর মেয়র আক্কাছসহ অন্য আসামিরা রয়েছেন আত্মগোপনে।


















