নিজস্ব প্রতিবেদক : পদ্মা নদীর চরাঞ্চলের ভয়ংকর ত্রাস ‘কাকন বাহিনী’র ২১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার (৯ নভেম্বর) ভোরে রাজশাহীর বাঘা, পাবনার আমিনপুর ও ঈশ্বরদী এবং কুষ্টিয়া দৌলতপুরের চরাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এসময় পাঁচটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, মাদক ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
ঘটনা সম্পর্কে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান গণমাধ্যমকে বলেন, কাকন বাহিনীর বিরুদ্ধে পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএন সদস্যদের যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ফাস্ট লাইট’। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টিমের এই অভিযানে ১ হাজার ২০০ সদস্য অংশ নেয়।
তিনি আরো জানান, অভিযানকালে পাঁচটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ দেশি অস্ত্র, মাদক ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এসময় কাকন বাহিনীর ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাজশাহীর বাঘা, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও নাটোরের লালপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী দৌলতপুরের মরিচা ইউনিয়নের চৌদ্দহাজার মৌজার নিচ খানপাড়া এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন নিহত হন। এ ঘটনায় বাহিনীপ্রধান হাসিনুজ্জামান কাকনসহ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানায় একটি মামলা হয়। এটিসহ তাদের বিরুদ্ধে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ায় মোট ছয়টি মামলা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পদ্মার চরে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। তারা চরের বালু ও জমি দখল নিয়ে গোলাগুলির ঘটনা ঘটান। এক চরে অপরাধ করে তারা আরেক চরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কখনো কখনো চরের বিশাল কলাবাগান, আবার সীমান্তের শূন্যরেখায় মাঠের মধ্যে গিয়ে আস্তানা গড়ে তোলে।
চার জেলাজুড়ে বিস্তৃত পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে প্রায় দুই দশক আগেও দুটি সন্ত্রাসী বাহিনীর উত্থান ঘটেছিল। তাদের দাবিকৃত হিস্যা (ভাগ) না দিয়ে চরের ফসল ঘরে তুলতে পারতেন না কেউ।
এ নিয়ে দ্বন্দ্বে তাদের হাতে ওই সময়ে অন্তত ৪১ জন মানুষ খুন হন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়। ওই দুই বাহিনীর নাম ছিল ‘পান্না বাহিনী’ ও ‘লালচাঁন বাহিনী’। আর পান্নার ওস্তাদ ছিলেন এই কাকন। পরবর্তীতে ‘ক্রস ফায়ারে’ পান্না নিহত হন। একইভাবে তার প্রতিপক্ষ লালচাঁনসহ দুই বাহিনীর আরো অন্তত ২৫ জন সদস্য নিহত হন। এরপর অনেকটা স্বস্তি ফিরে পদ্মার চরে।
কাকন বাহিনীর উত্থান : পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাকনের পুরো নাম মো. হাসানুজ্জামান কাকন ওরফে ইঞ্জিনিয়ার কাকন। তার বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদী কলেজ রোড এলাকায়। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, তার পৈতৃক নিবাস কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড় গ্রামে।
২০০১ সালের দিকে এলাকায় একটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে পরিবারসহ দৌলতপুর থেকে ঈশ্বরদী উপজেলায় বসবাস শুরু করেন তিনি। সিভিল বিষয়ে ১৯৯৪ সালে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করায় নামের আগে যোগ হয় ‘ইঞ্জিনিয়ার’।
সূত্রগুলো বলছে, ২০০৫ সালে পান্না নিহত হলে ২০০৭ সালে কাকন সৌদি আরবে চলে যান। বছরকয়েক পর ফিরে এসে আওয়ামী লীগের নেতাদের আশ্রয়ে থেকে এলাকার বালুমহালগুলো ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েই তিনি গড়ে তোলেন বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী।আধিপত্য বিস্তার, বালুমহল নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও ডাকাতির মতো অভিযোগ রয়েছে কাকন বাহিনীর বিরুদ্ধে। পদ্মার চরের বালু থেকে শুরু করে সবকিছুতেই কাকন বাহিনীর ভাগ থাকতে হবে।
ভুক্তভোগীদের বরাত দিয়ে আমাদের বাঘা (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে কাকন বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে সাহস পায়নি। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় মামলা করেন ভুক্তভোগীরা।
চলতি বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে বিভিন্ন ঘটনায় ‘কাকন বাহিনী’র বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা হয়। এর মধ্যে ঈশ্বরদী থানায় তিনটি, বাঘা, লালপুর ও দৌলতপুর থানায় একটি করে। ঈশ্বরদী থানার দুটি মামলা ও বাঘা থানার মামলাটি নৌ পুলিশ তদন্ত করছে। কোনো মামলার তদন্তই শেষ হয়নি এখনো।


















